তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধান শস্য উৎপাদনকারী দেশগুলোয় রেকর্ড পরিমাণ খাদ্য মজুদ ও ভালো ফসলের পূর্বাভাসের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহে এর নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই সীমিত থাকবে। খবর রয়টার্স।
আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, এবারের এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ার একটি বড় অংশে তীব্র তাপদাহ ও খরা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে আমেরিকার দেশগুলোয় হতে পারে ভারি বৃষ্টিপাত। এ পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতীতে এমন আবহাওয়ায় ব্যাপক ফসলহানি, সামাজিক অস্থিরতা এবং শত কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল। তবে অতীতের তুলনায় এবার বিশ্বের সামনে একটি বড় সুরক্ষা কবচ রয়েছে, যা আগের সংকটের সময়ে ছিল না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) অর্থনীতিবিদ শার্লি মুস্তাফা বলেন, ‘চাল ও অন্য প্রয়োজনীয় দানাদার শস্যের বর্তমান মজুদ এবং সাম্প্রতিক বাম্পার ফলন একটি আশার আলো দেখাচ্ছে। এ বিশাল মজুদ এল নিনোর তাৎক্ষণিক প্রভাব মোকাবেলায় একটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।’
২০১৫-১৬ সালের সর্বশেষ সুপার এল নিনোর সময় তীব্র খরা, বন্যা ও রেকর্ড তাপমাত্রার কারণে বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। এর আগে ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোয়ও বিশ্বব্যাপী ব্যাপক বনভূমি পুড়ে যাওয়া, বন্যা ও ফসলহানির ঘটনা ঘটে।
২০২৬-২৭ সালের পরিস্থিতি ভিন্ন। গত কয়েক বছরের রেকর্ড ফলন, বিশেষ করে আমদানিকারক ও রফতানিকারক দেশগুলোর খাদ্য মজুদকে সমৃদ্ধ করেছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই নাগাদ বৈশ্বিক গমের মজুদ দাঁড়াবে ২৭ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার টনে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশ্বের শীর্ষ গম রফতানিকারক দেশ রাশিয়াসহ উত্তর গোলার্ধের অন্য প্রধান দেশগুলোয় এবারো বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গম উৎপাদন খরায় ব্যাহত হলেও বিশ্ববাজারে বড় কোনো উদ্বেগ তৈরি হয়নি। সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের এ শক্তিশালী সরবরাহের কারণে আমদানিকারক দেশগুলো আগামী চার থেকে ছয় মাসের জন্য নিশ্চিন্ত রয়েছে।
চাল বাজারের পরিস্থিতিও বেশ মজবুত। ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বে চালের মজুদ রেকর্ড ১৯ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার টনে পৌঁছায়। বিশ্ব চাল বাজারের ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী দেশ ভারতে বর্তমানে সরকারি লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি মজুদ রয়েছে। দিল্লির ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগের এল নিনোর বছরগুলোয় ভারতকে রফতানি নিষেধাজ্ঞা দিতে হলেও এবার মজুদ বেশি থাকায় তেমন কোনো আশঙ্কা নেই।
একইভাবে বড় আমদানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়ায়ও রেকর্ড চালের মজুদ রয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে সেখানকার কৃষক নির্ধারিত সময়ের আগেই ধান রোপণ করছেন। থাইল্যান্ডে জলাধারগুলোর পানির স্তর গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা নতুন ফসলের জন্য বড় সহায়ক হবে।
অন্য পণ্যের মধ্যে ইউএসডিএ আগামী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভুট্টার বৈশ্বিক মজুদ ৩০ কোটি ৩৪ লাখ টনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়েছে। সয়াবিনের মজুদ ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৫৫ লাখ টন। কমোডিটি বিশ্লেষক টোবিন গোরি জানান, সরবরাহ ভালো থাকায় এবং জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় বিশ্ববাজারে ভুট্টা, সয়াবিন ও গমের দাম সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কমেছে।
খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য কেনা বা স্থানীয়ভাবে রফতানি নিষেধাজ্ঞা দেয়ার মতো ঘটনা বৈশ্বিক বাজারকে এখনো ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এফএও জোর দিয়ে বলেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতি কেমন হবে, তা নির্ভর করছে আমদানিকারক দেশগুলোর ধৈর্য এবং রফতানিকারক দেশগুলো কোনো সংরক্ষণবাদী নীতি না নিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখছে কিনা তার ওপর।